ভালোবাসার শেষ ঠিকানা
লেখাঃ শফিকুল ইসলাম বিশ্বাস
শুরুটা ছিল এক সাধারণ বিকেলের
জীবনের সবচেয়ে বড় গল্পগুলো কখনো ধুমধাম করে শুরু হয় না। সেগুলো শুরু হয় খুব সাধারণ কোনো বিকেলে, একটুখানি হাসিতে, কিংবা অচেনা কারও সঙ্গে চোখাচোখিতে।
২০১৬ সাল।
তখন আমার বয়স খুব বেশি নয়। স্বপ্ন ছিল বড়, কিন্তু সামর্থ্য ছিল ছোট। পাশের একটি উপজেলায় একটি এনজিওতে চাকরি পেয়েছিলাম। বেতন খুব বেশি ছিল না, তবুও নিজের উপার্জনের টাকায় বেঁচে থাকার আনন্দটা ছিল অন্যরকম। মনে হতো, জীবন ধীরে ধীরে নিজের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
অফিসটি ছিল বাজার থেকে একটু দূরে। চারপাশে বিশাল মাঠ, কিছু পুরোনো গাছ, আর দিনের শেষে পাখিদের কোলাহল। সহকর্মীদের বেশিরভাগই পরিবার নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকতেন। আমি একাই ছিলাম। তাই অফিসের একটি ছোট্ট কক্ষই ছিল আমার থাকার জায়গা।
সন্ধ্যা নামলেই অফিসটা কেমন যেন নির্জন হয়ে যেত।
টিউবলাইটের আলোয় দেয়ালের ছায়াগুলো লম্বা হয়ে থাকত। দূরে কোথাও কুকুর ডাকত। আর আমি এক কাপ চা হাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতাম—জীবন কি সত্যিই শুধু এতটুকুই?
সেই সময়ই প্রথম তাকে দেখেছিলাম।
অফিসের পাশের সরু রাস্তা ধরে একটি মেয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। সাদা-নীল একটি সাধারণ পোশাক, কাঁধে ওড়না, মুখে কোনো সাজসজ্জা নেই। তবুও অদ্ভুত এক শান্তি ছিল তার চোখে।
আমি তাকিয়ে ছিলাম।
সে একবার আমার দিকে তাকিয়েছিল।
তারপর আবার নিজের পথে হাঁটতে শুরু করেছিল।
সেদিনের সেই কয়েক সেকেন্ডের চোখাচোখি যে আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ গল্পের সূচনা হয়ে যাবে, তা আমি জানতাম না।
এরপর প্রতিদিনই তাকে দেখতে পেতাম।
কখনো বাজারে, কখনো রাস্তার মোড়ে, কখনো বিকেলের শেষ আলোয়।
প্রথম দিকে শুধু চোখে চোখ পড়ত।
তারপর একদিন হালকা একটি হাসি।
সেই হাসির উত্তর দিতে আমারও দেরি হয়নি।
ধীরে ধীরে পরিচয় হলো।
কথা বাড়ল।
কীভাবে যেন প্রতিদিনের একটি অভ্যাস হয়ে গেল।
সকালে তাকে না দেখলে দিনটা অসম্পূর্ণ লাগত।
সন্ধ্যায় তার সঙ্গে দুটো কথা না হলে ঘুম আসত না।
মানুষ যখন প্রেমে পড়ে, তখন সে বুঝতেই পারে না ঠিক কোন মুহূর্তে নিজের হৃদয়ের চাবিটা অন্য কারও হাতে তুলে দিয়েছে।
আমিও বুঝিনি।
শুধু একদিন হঠাৎ অনুভব করলাম—
আমি আর একা নই।
আমার প্রতিটি পরিকল্পনায়, প্রতিটি স্বপ্নে, প্রতিটি আগামীতে একটি মানুষের উপস্থিতি জায়গা করে নিয়েছে।
আমি তখনও জানতাম না—
জীবন আমাকে একটি গল্প উপহার দিতে যাচ্ছে।
যে গল্পের শুরুতে থাকবে ভালোবাসা,
মাঝখানে থাকবে বিশ্বাস,
আর শেষ পর্যন্ত বয়ে বেড়াতে হবে এমন একটি দাগ,
যা সময়ও মুছে দিতে পারবে না…
কাছাকাছি আসার দিনগুলো
ভালোবাসা কখনো হঠাৎ করে জন্ম নেয় না।
সে ধীরে ধীরে মানুষের ভেতরে শিকড় গাড়ে। প্রথমে কৌতূহল, তারপর অভ্যাস, এরপর অপেক্ষা। একসময় মানুষ বুঝতে পারে—যাকে ছাড়া এতদিন দিব্যি বেঁচে ছিল, আজ তাকেই ছাড়া একটি দিনও অসম্পূর্ণ মনে হয়।
সেদিনগুলো ছিল শরতের শেষ বিকেলের মতো শান্ত।
প্রতিদিন সকালবেলা অফিসের গেট খুলেই অজান্তে আমার চোখ চলে যেত পাশের সরু রাস্তাটার দিকে। জানতাম না সে আসবে কি না, তবুও অপেক্ষা করতাম। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, অপেক্ষা করতে কখনো বিরক্ত লাগত না।
কিছুদিন পর আমাদের মধ্যে “কেমন আছেন?” থেকে “খেয়েছেন?”—এই দূরত্বটুকুও কমে গেল।
একদিন দুপুরে অফিসের সামনে ছোট্ট একটি চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলাম। সে পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। আমি সাহস করে বললাম,
— “এক কাপ চা খাবেন?”
সে একটু হেসে বলল,
— “আপনি কি সবাইকেই এভাবে চা খাওয়ান?”
আমি হেসে উত্তর দিলাম,
— “না… শুধু যাদের সঙ্গে আবার কথা বলতে ইচ্ছে করে।”
সেদিন সে চা খায়নি।
কিন্তু যাওয়ার আগে একবার ফিরে তাকিয়ে হেসেছিল।
সেই হাসিটুকু যেন সারাদিন আমার সঙ্গে ছিল।
এরপর থেকে কথাগুলো আর গুনে শেষ করা যেত না। কখনো বিকেলে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে, কখনো বাজার থেকে ফেরার পথে, কখনো অফিসের বারান্দায়।
জীবনের গল্প, ছোটবেলার স্মৃতি, ভবিষ্যতের স্বপ্ন—সবকিছু নিয়েই কথা হতো।
আমি লক্ষ্য করলাম, তার সামনে দাঁড়ালে আমার ভেতরের সব ক্লান্তি কোথায় যেন হারিয়ে যায়।
অফিসের ব্যস্ত দিনও তার একটি ফোনকলের অপেক্ষায় শেষ হতো।
রাত নামলে অফিসটা আরও নীরব হয়ে যেত।
বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।
দূরের কোনো মসজিদ থেকে ভেসে আসা এশার আজান।
আমি ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকতাম।
হঠাৎ স্ক্রিন জ্বলে উঠত।
তার নাম।
“ঘুমিয়ে পড়েছেন?”
আমি লিখতাম,
“না… আপনার অপেক্ষায় ছিলাম।”
সে লিখত,
“আমিও।”
এই ছোট্ট দুটি শব্দ আমার পুরো রাতটাকে আলোকিত করে দিত।
এরপর একদিন সে প্রথম অফিসে এল।
অন্য সহকর্মীরা তখন যার যার কাজে ব্যস্ত।
সে লাজুক চোখে চারপাশ দেখে বলল,
“এখানেই থাকেন?”
আমি মাথা নেড়ে বললাম,
“হ্যাঁ।”
সে ছোট্ট ঘরটার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“আপনি একা থাকেন… খুব খারাপ লাগে না?”
আমি একটু হেসে বললাম,
“আগে লাগত। এখন আর লাগে না।”
সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কেন?”
আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম,
“কারণ এখন আমার একাকিত্বেরও একজন সঙ্গী আছে।”
সে কিছু বলল না।
শুধু মাথা নিচু করে মৃদু হাসল।
সেই হাসির মধ্যে ছিল লজ্জা, ছিল নীরব স্বীকৃতি, আর ছিল অজানা এক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত।
এরপর দিনগুলো আরও দ্রুত বদলাতে লাগল।
আমাদের কথা বাড়ল, দেখা বাড়ল, অনুভূতির গভীরতাও বাড়তে লাগল।
আমি বুঝতে পারছিলাম, আমার পৃথিবী ধীরে ধীরে একজন মানুষকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে।
তখনও জানতাম না—
ভালোবাসা মানুষকে যেমন আকাশ ছুঁতে শেখায়,
তেমনি একদিন মাটিতে পড়ে ভাঙার শব্দও শুনিয়ে যায়।
কিন্তু সেই সময়ে ভবিষ্যতের কোনো অন্ধকার চোখে পড়ত না।
আমরা দুজনই তখন বিশ্বাস করতাম—
এই পথের শেষেই হয়তো একটি ছোট্ট সংসার অপেক্ষা করছে।
আর আমি…
আমি তখনও জানতাম না,
সবচেয়ে সুন্দর স্বপ্নগুলোই কখনো কখনো সবচেয়ে নিঃশব্দে ভেঙে যায়।
রাতের নীরবতা ও স্বপ্নের সংসার
রাতের একটা নিজস্ব ভাষা আছে।
দিনের আলোয় যে কথাগুলো মানুষ বলতে পারে না, রাতের নীরবতা সেগুলো খুব সহজেই শুনে ফেলে। অন্ধকার যেন মানুষের বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা সব অনুভূতিকে একটু একটু করে বাইরে নিয়ে আসে।
আমাদের সম্পর্কটাও ঠিক এমনই ছিল।
দিনের ব্যস্ততায় আমরা ছিলাম সাধারণ দুজন মানুষ। কিন্তু রাত নামলেই পৃথিবী যেন বদলে যেত। অফিসের কাজ শেষ করে সবাই যার যার মতো চলে যেত। চারপাশ ধীরে ধীরে নিশ্চুপ হয়ে আসত। দূরের রাস্তা ফাঁকা হয়ে যেত, বাতাসে ভেসে আসত ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, আর আকাশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ত অসংখ্য তারা।
সেই নীরবতার মাঝেই শুরু হতো আমাদের গল্প।
কখনো অফিসের বারান্দায় বসে চাঁদ দেখতাম।
কখনো ভবিষ্যতের কথা বলতাম।
কখনো কোনো কথা না বলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাশাপাশি বসে থাকতাম।
সেদিনই প্রথম বুঝেছিলাম, সব সম্পর্কের জন্য শব্দের প্রয়োজন হয় না। কিছু সম্পর্ক নীরবতাকেও ভাষা বানিয়ে ফেলে।
সে হঠাৎ একদিন জিজ্ঞেস করেছিল,
— “তোমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন কী?”
আমি একটু ভেবে বলেছিলাম,
— “অনেক বড় কিছু নয়। একটা ছোট্ট বাড়ি। সামনে কয়েকটা ফুলের গাছ। সন্ধ্যায় কাজ শেষে বাড়ি ফিরলে কেউ দরজা খুলে বলবে—’এলে?'”
সে হেসে বলেছিল,
— “এত ছোট স্বপ্ন?”
আমি উত্তর দিয়েছিলাম,
— “যে মানুষ কখনো নিজের বলতে কিছু পায়নি, তার কাছে ছোট স্বপ্নও অনেক বড়।”
সে কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল।
তারপর খুব আস্তে বলেছিল,
— “স্বপ্নটা সুন্দর।”
সেদিন কথাটা শুনে মনে হয়েছিল, হয়তো সেই স্বপ্নে সেও নিজেকে কল্পনা করেছে।
তারপর থেকে আমি ভবিষ্যৎকে অন্য চোখে দেখতে শুরু করলাম।
প্রতিটি মাসের বেতন হাতে পেলে খরচের আগে হিসাব করতাম—কতটুকু সঞ্চয় করা যায়। মনে হতো, আজ না হোক কাল, আমাদেরও একটা সংসার হবে।
আমি একটা খাতা কিনেছিলাম।
সেই খাতার প্রথম পাতায় লিখেছিলাম—
“আমাদের আগামী।”
সেখানে বাড়ির নকশা আঁকতাম। লিখতাম, কোন ঘরে বই থাকবে, কোথায় জানালার পাশে একটা দোলনা থাকবে, উঠোনে কী ফুল লাগাব।
আজ ভাবলে নিজের ওপরই হাসি পায়।
একজন মানুষ কত সহজে ভবিষ্যতের ওপর বিশ্বাস করে ফেলে!
একদিন সন্ধ্যায় হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল।
অফিসের টিনের ছাদে বৃষ্টির শব্দ পড়ছিল টুপটাপ করে। আমরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিলাম।
আমি বললাম,
— “একদিন যদি আমাদের বাড়ি হয়, বৃষ্টি নামলে আমরা ছাদে দাঁড়িয়ে চা খাব।”
সে মুচকি হেসে বলল,
— “আর যদি খুব ঝড় হয়?”
আমি উত্তর দিলাম,
— “তাহলে আরও শক্ত করে হাত ধরব।”
সে কোনো উত্তর দেয়নি।
শুধু এক মুহূর্তের জন্য আমার দিকে তাকিয়েছিল।
সেই দৃষ্টিতে আমি বিশ্বাস খুঁজে পেয়েছিলাম।
হয়তো ভুল করেছিলাম।
কিন্তু তখন সেই ভুলটাই ছিল আমার সবচেয়ে সুন্দর সত্য।
রাত যত গভীর হতো, আমাদের গল্পও তত গভীর হতো।
সে তার ছোটবেলার কথা বলত।
আমি আমার সংগ্রামের গল্প বলতাম।
আমরা দুজনেই বিশ্বাস করতাম, একদিন এই কঠিন সময় শেষ হবে।
তারপর শুরু হবে নতুন জীবন।
আমি বুঝতেই পারিনি, ভালোবাসার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—এটি মানুষকে ভবিষ্যৎকে নিশ্চিত বলে বিশ্বাস করায়।
আর জীবন…
জীবন কখনো কোনো প্রতিশ্রুতিপত্রে সই করে না।
যে রাতগুলো একসময় আমার কাছে শান্তির ছিল, সেগুলোর বুকেই হয়তো অদৃশ্য হয়ে জন্ম নিচ্ছিল এক ঝড়।
আমি তখনও তা টের পাইনি।
শুধু স্বপ্ন দেখে গিয়েছিলাম।
স্বপ্নেরও যে মেয়াদ থাকে, সেটা জানার মতো অভিজ্ঞতা তখনও আমার হয়নি।
অদৃশ্য ফাটল
কোনো দেয়াল একদিনে ভেঙে পড়ে না।
প্রথমে একটি সূক্ষ্ম ফাটল দেখা দেয়। এতটাই সূক্ষ্ম যে দূর থেকে বোঝাই যায় না। মানুষ তখনও নিশ্চিন্ত থাকে। ভাবে, সবকিছু আগের মতোই আছে।
সম্পর্কও ঠিক তেমন।
ভাঙনের শব্দ শোনার অনেক আগেই নীরবে তার শুরু হয়ে যায়।
শীত তখন ধীরে ধীরে নেমে আসছে।
সকালের কুয়াশায় অফিসের সামনের রাস্তাটা ঝাপসা হয়ে থাকত। দূরের মানুষগুলোকে চিনে নেওয়া যেত না। আমার জীবনটাও যেন ঠিক তেমনই কুয়াশায় ঢেকে যেতে শুরু করেছিল।
প্রথমে খুব ছোট ছোট কিছু পরিবর্তন চোখে পড়ল।
আগে সে নিজেই ফোন করত।
এখন আমি ফোন করলে অনেক সময় ধরত না।
আগে প্রতিটি মেসেজের উত্তর কয়েক মিনিটের মধ্যেই চলে আসত।
এখন কখনো কয়েক ঘণ্টা, কখনো পুরো একটা দিন কেটে যেত।
আমি নিজেকে বোঝাতাম—
হয়তো ব্যস্ত আছে।
হয়তো কোনো সমস্যায় আছে।
হয়তো আমি অযথাই বেশি ভাবছি।
ভালোবাসার একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে।
এটা মানুষকে সত্যের চেয়ে অজুহাতে বেশি বিশ্বাস করতে শেখায়।
এক সন্ধ্যায় আমি অপেক্ষা করছিলাম।
অফিসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ।
সেদিন সে আসেনি।
পরদিনও না।
তার পরের দিন দেখা হলো।
আমি অভিমান করে বললাম,
— “কাল আসোনি কেন?”
সে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
— “কাজ ছিল।”
আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি।
কারণ আমি বিশ্বাস করতাম, ভালোবাসার মানুষকে বেশি প্রশ্ন করলে সে কষ্ট পায়।
আজ বুঝি—
কখনো কখনো প্রশ্ন না করাটাই সবচেয়ে বড় ভুল হয়ে যায়।
এরপর লক্ষ্য করলাম, তার চোখের ভেতর আগের সেই শান্তি নেই।
কথা বললেও যেন মনোযোগ অন্য কোথাও।
হাসলেও সেই হাসি আর আগের মতো প্রাণ খুলে আসে না।
আমি গল্প বলি—
সে শুধু মাথা নাড়ে।
আমি ভবিষ্যতের কথা বলি—
সে বিষয় বদলে দেয়।
আমি বুঝতে পারছিলাম, আমাদের মাঝখানে অদৃশ্য কোনো দেয়াল তৈরি হচ্ছে।
কিন্তু সেই দেয়াল ভাঙার সাহস আমার ছিল না।
কারণ আমি ভয় পেতাম।
সত্য জানার চেয়ে হারিয়ে ফেলার ভয়টাই তখন বড় ছিল।
একদিন বিকেলে বাজারে গিয়েছিলাম।
দূর থেকে তাকে দেখলাম।
সে কয়েকজন মানুষের সঙ্গে কথা বলছে।
আমি এগিয়ে যেতেই সে একটু অস্বস্তি নিয়ে বলল,
— “তুমি যাও… পরে কথা হবে।”
কথাটা খুব সাধারণ ছিল।
কিন্তু কেন জানি বুকের ভেতর একটা অচেনা শূন্যতা তৈরি হলো।
আমি সেদিন প্রথমবার অনুভব করলাম—
আমার উপস্থিতি হয়তো আর আগের মতো গুরুত্বপূর্ণ নেই।
সেই রাতটায় ঘুম আসেনি।
অফিসের ছোট্ট ঘরটায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
টিনের চালের ওপর বাতাসের শব্দ হচ্ছিল।
মনে হচ্ছিল, বাতাস যেন বারবার আমাকে কিছু বলতে চাইছে।
কিন্তু আমি শুনতে চাইছিলাম না।
মানুষ যখন কাউকে খুব ভালোবাসে, তখন সে সত্যের সামনে দাঁড়িয়েও চোখ বন্ধ করে রাখে।
আমি ঠিক সেটাই করছিলাম।
কয়েকদিন পর সে হঠাৎ বলল,
— “জীবনে শুধু ভালোবাসা থাকলেই হয় না।”
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
— “তাহলে আর কী লাগে?”
সে একটু দূরে তাকিয়ে বলল,
— “অনেক কিছু।”
আমি জানতে চেয়েছিলাম, সেই “অনেক কিছু” আসলে কী।
কিন্তু সে আর কিছু বলেনি।
সেদিন তার নীরবতাই ছিল সবচেয়ে দীর্ঘ উত্তর।
তারপর থেকে আমি নিজের ভেতরই পরিবর্তন টের পেলাম।
আগের মতো নিশ্চিন্ত থাকতে পারতাম না।
ফোন বেজে উঠলেই বুক ধড়ফড় করত।
অপরিচিত নম্বর দেখলেও মনে হতো, হয়তো সে।
রাতে ঘুম ভেঙে গেলে প্রথমেই ফোনটা হাতে নিতাম।
কোনো মেসেজ নেই।
কোনো কল নেই।
শুধু নীরবতা।
আর সেই নীরবতা ধীরে ধীরে শব্দের চেয়েও ভারী হয়ে উঠছিল।
ভালোবাসা যখন পূর্ণতা পায়, তখন মানুষ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে।
আর যখন ভাঙতে শুরু করে, তখন মানুষ অতীত আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়।
আমি তখনও অতীতের মানুষ হয়ে গিয়েছিলাম।
ভাবতাম, হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে।
হয়তো এই দূরত্ব কেটে যাবে।
হয়তো সে আবার আগের মতো ফিরে আসবে।
আমি জানতাম না—
কিছু মানুষ ফিরে আসে না।
শুধু তাদের স্মৃতি ফিরে ফিরে আসে।
আর কিছু ফাটল আছে—
যেগুলো একবার তৈরি হলে, যতই রঙ করা হোক, কোনোদিন পুরোপুরি ঢেকে রাখা যায় না।
সেদিনও আমি বুঝিনি…
আমাদের সম্পর্কের দেয়ালটি তখনও দাঁড়িয়ে ছিল ঠিকই,
কিন্তু ভেতর থেকে তার ইটগুলো একে একে খসে পড়তে শুরু করেছে।
ভাঙনের আগে শেষ বিশ্বাস
কিছু সম্পর্কের শেষটা বিচ্ছেদ দিয়ে শুরু হয় না।
শুরু হয় অপেক্ষা দিয়ে।
অপেক্ষা—একটি ফোনকলের।
একটি বার্তার।
একটি দেখা হওয়ার।
একটি ব্যাখ্যার।
আর সেই অপেক্ষা যত দীর্ঘ হয়, মানুষের ভেতরের বিশ্বাস তত নিঃশব্দে ক্ষয় হতে থাকে।
ডিসেম্বরের এক কুয়াশাভেজা সকাল।
অফিসের উঠোনে শিশির জমেছে। সূর্যের আলো এখনও পুরোপুরি মাটিতে নামেনি। হাতে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম।
চায়ের স্বাদ আগের মতোই ছিল।
শুধু জীবনটাই যেন আগের মতো ছিল না।
অনেক দিন হলো সে আগের মতো আসে না।
কথাও বলে না।
মাঝে মাঝে মনে হতো, আমি যেন একা একটা সম্পর্ক টেনে নিয়ে চলেছি।
তবুও হাল ছাড়িনি।
ভালোবাসা মানুষকে অবিশ্বাসের চেয়েও বেশি জেদি করে তোলে।
সেদিন দুপুরে আমি তাকে ফোন করলাম।
একবার…
দুবার…
তিনবার…
কোনো উত্তর নেই।
কিছুক্ষণ পর একটি ছোট্ট বার্তা এলো—
“ব্যস্ত আছি। পরে কথা বলব।”
মাত্র তিনটি শব্দ।
কিন্তু সেই তিনটি শব্দের ভেতর যেন কয়েক মাইল দূরত্ব লুকিয়ে ছিল।
আমি ফোনটা পকেটে রেখে নিজেকে বোঝালাম—
“সমস্যা নেই। মানুষ তো ব্যস্ত থাকতেই পারে।”
কিন্তু মন বলছিল অন্য কথা।
রাতে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও তার ফোন এল না।
আমি নিজেই আবার লিখলাম—
“সব ঠিক আছে তো?”
অনেকক্ষণ পর উত্তর এল—
“হ্যাঁ।”
একটা শব্দ।
কখনো কখনো একটি শব্দই বুঝিয়ে দেয়, সম্পর্কের ভেতর আর কোনো গল্প বাকি নেই।
এরপর কয়েক দিন ধরে আমি লক্ষ্য করলাম, সে যেন আমাকে এড়িয়ে চলছে।
দেখা হলেও তাড়াহুড়ো।
কথা হলেও অস্থিরতা।
চোখে চোখ রাখার সময়টুকুও যেন তার নেই।
আমার ভেতরে তখন দুটো মানুষ বাস করছিল।
একজন বলছিল—
“বিশ্বাস করো।”
আরেকজন বলছিল—
“সত্যিটা জানতে হবে।”
আমি প্রথম মানুষটার কথাই শুনছিলাম।
কারণ দ্বিতীয় মানুষটার কথা শুনলে হয়তো আমার পুরো পৃথিবীটাই বদলে যেত।
একদিন সন্ধ্যায় সাহস করে বললাম,
— “আমাদের কি কিছু হয়েছে?”
সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর মৃদু স্বরে বলল,
— “সবকিছু আগের মতো থাকে না।”
আমি প্রশ্ন করলাম,
— “মানে?”
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— “জীবন বদলে যায়।”
আমি বললাম,
— “জীবন বদলাতে পারে, কিন্তু মানুষ কি এত সহজে বদলে যায়?”
সে কোনো উত্তর দিল না।
শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
সেদিন তার নীরবতাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় ভয়।
সেই রাতেই আমি আমার পুরোনো খাতাটা খুললাম।
প্রথম পাতায় লেখা—
“আমাদের আগামী।”
পাতাগুলো উল্টাতে উল্টাতে দেখলাম, কত স্বপ্ন লিখে রেখেছি।
একটা ছোট্ট বাড়ি।
একটা বারান্দা।
বৃষ্টির দিনে দু’কাপ চা।
আর পাশে একটি নাম…
আমি অনেকক্ষণ সেই নামটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
হঠাৎ মনে হলো—
স্বপ্নেরও কি মেয়াদ শেষ হয়ে যায়?
এরপরের কয়েক সপ্তাহে আমি আর আগের মানুষটি ছিলাম না।
কাজ করতাম।
হাসতাম।
মানুষের সঙ্গে কথা বলতাম।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে যেন প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে যাচ্ছিলাম।
অদ্ভুত বিষয় হলো—
ভাঙা মানুষকে বাইরে থেকে দেখে বোঝা যায় না।
সে অফিসেও যায়।
কাজও করে।
হাসেও।
শুধু রাতে, সবাই ঘুমিয়ে গেলে, সে নিজের ভাঙা হৃদয়ের শব্দ শুনতে পায়।
তখনও আমি জানতাম না, সামনে আরও কঠিন দিন অপেক্ষা করছে।
আমি তখনও বিশ্বাস করতাম—
একদিন সে ফিরে এসে বলবে,
“সব ভুল বোঝাবুঝি ছিল।”
আমি তখনও জানতাম না—
জীবনের সবচেয়ে নিষ্ঠুর সত্যগুলো কোনো ঘোষণা দিয়ে আসে না।
তারা আসে নিঃশব্দে।
আর একদিন হঠাৎ বুঝিয়ে দেয়—
যে মানুষটিকে তুমি নিজের ভবিষ্যৎ ভেবেছিলে,
সে হয়তো অনেক আগেই তোমাকে তার অতীত বানিয়ে ফেলেছে।
শেষ চেষ্টা
ভালোবাসার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হয়তো এটাই—
সবাই যখন বলে, “ছেড়ে দাও”, তখনও হৃদয় ফিসফিস করে বলে, “আর একবার চেষ্টা করো।”
সেই সময়টায় আমার জীবন যেন দুটি পথে দাঁড়িয়ে ছিল। একদিকে সন্দেহ, অন্যদিকে বিশ্বাস। আমি জানতাম, কিছু একটা বদলে গেছে। কিন্তু আমার মন তখনও শেষবারের মতো সম্পর্কটাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইছিল।
মানুষ যখন সত্যিকারের ভালোবাসে, তখন সে হেরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত হার মানতে চায় না।
জানুয়ারির এক বিকেল।
আকাশে মেঘ ছিল না, তবুও আমার বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে ছিল।
অফিসের কাজ শেষ করে অনেকক্ষণ একা বসে রইলাম। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে ছিল কিছু কাগজ, একটি কলম, আর আমার অসমাপ্ত ভবিষ্যৎ।
হঠাৎ মনে হলো—
এভাবে আর কতদিন?
যদি সত্যিই তাকে ভালোবাসি, তাহলে সম্পর্কটাকে একটা সম্মানজনক পরিণতি দেওয়ার চেষ্টা তো করতেই পারি।
সেদিনই সিদ্ধান্ত নিলাম—
আমি বিয়ের প্রস্তাব দেব।
রাতে মাকে ফোন করলাম।
অনেকদিন পর এত দীর্ঘ কথা হলো।
মা বললেন,
— “কেমন আছিস?”
আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম,
— “মা… আমি একটা মেয়েকে বিয়ে করতে চাই।”
ফোনের ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর মায়ের কণ্ঠে একটুখানি হাসি।
— “তাহলে একদিন নিয়ে আয়। আমরা কথা বলব।”
সেদিন অনেকদিন পর বুকের ভেতর একটু আলো জ্বলে উঠেছিল।
মনে হচ্ছিল, হয়তো সবকিছু আবার ঠিক হয়ে যাবে।
পরের কয়েকদিন আমি নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম।
বেতনের কিছু টাকা আলাদা করে রাখলাম।
মনে মনে হিসাব করলাম—
সংসার শুরু করতে খুব বেশি কিছু লাগে না।
দুজন মানুষের আন্তরিকতা থাকলেই একটা ছোট্ট ঘর স্বর্গ হয়ে উঠতে পারে।
আমি বিশ্বাস করতাম,
ভালোবাসার সবচেয়ে বড় সম্পদ টাকা নয়—
বিশ্বাস।
আজ বুঝি, সবাই একইভাবে বিশ্বাস করে না।
কয়েকদিন পর মাকে সব খুলে বললাম।
তিনি মন দিয়ে শুনলেন।
তারপর বললেন,
— “যদি তোমরা দুজন একে অপরকে সম্মান করো, তাহলে আমরা আপত্তি করব কেন?”
মায়ের সেই কথাটা শুনে মনে হলো,
পৃথিবীতে এখনও কিছু মানুষ আছে, যারা মানুষের মনকে সম্পদের চেয়ে বড় মনে করে।
আমি বোনদের সঙ্গেও কথা বললাম।
তাঁরাও রাজি হলেন।
পরিবারের মুখে আপত্তি নয়, আশীর্বাদ দেখে আমার সাহস আরও বেড়ে গেল।
কয়েকদিন পর মা আর বোনেরা তার বাড়িতে গেলেন।
আমি অফিসে বসে ছিলাম।
কাজে মন বসছিল না।
বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলাম।
প্রতিটি মিনিট যেন এক একটি ঘণ্টার মতো দীর্ঘ লাগছিল।
মনে মনে কল্পনা করছিলাম—
হয়তো আজই আমাদের নতুন জীবনের প্রথম দিন।
হয়তো আজ থেকেই সব অনিশ্চয়তার শেষ।
হয়তো…
মানুষের সবচেয়ে বড় ভুলগুলো শুরু হয় “হয়তো” শব্দটি দিয়ে।
বিকেলের দিকে ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে মায়ের নাম।
ফোন ধরতেই বুঝলাম, কিছু একটা ঠিক নেই।
কণ্ঠে সেই স্বাভাবিক উষ্ণতা নেই।
মা খুব ধীরে বললেন,
— “বাবা… আমরা ফিরে আসছি।”
আমি শুধু জিজ্ঞেস করলাম,
— “কী হয়েছে?”
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর ভাঙা গলায় তিনি বললেন,
— “আজ কথা না বলি। বাড়ি এসে বলব।”
লাইন কেটে গেল।
আমি অনেকক্ষণ ফোনটা হাতে নিয়ে বসে রইলাম।
সেদিন প্রথমবার আমার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত শীতলতা নেমে এলো।
যেন কোনো অদৃশ্য ঝড় আমার দিকে এগিয়ে আসছে।
সন্ধ্যা নামল।
অফিসের আঙিনায় অন্ধকার নেমে এলো।
আমি একা বসে ছিলাম।
জানালার বাইরে বাতাসে গাছের ডাল দুলছিল।
হঠাৎ মনে হলো—
প্রকৃতি যেন মানুষের আগেই সবকিছু টের পেয়ে যায়।
আমার বুকের ভেতর তখনও একফোঁটা আশা বেঁচে ছিল।
আমি ভাবছিলাম—
হয়তো কোনো ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে।
হয়তো কয়েকদিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু মানুষ অনেক সময় যে স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে বাঁচে,
সেই স্বপ্নই সবচেয়ে নীরবে ভেঙে পড়ে।
আর সেই ভাঙার শব্দ—
কেবল সেই মানুষটিই শুনতে পায়,
যে তার সমস্ত ভবিষ্যৎ একটিমাত্র নামের ওপর লিখে রেখেছিল।
সেদিন আমি জানতাম না,
পরের দিনগুলো আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় হয়ে উঠবে।
আর আমি,
যে মানুষটি ভালোবাসার জন্য পৃথিবীর সঙ্গে লড়তে প্রস্তুত ছিলাম,
খুব শিগগিরই শিখতে চলেছিলাম—
সব যুদ্ধ জিতে গেলেও,
সব ভালোবাসা জেতা যায় না।
অপমানের দরজা
কিছু দরজা মানুষের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।
আর কিছু দরজা খুলেই মানুষ বুঝতে পারে—সে ভুল ঠিকানায় এসেছিল।
সেদিন বিকেলে আকাশটা অদ্ভুত রকমের নিস্তব্ধ ছিল। সূর্য ডুবে যাচ্ছিল, কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল, আলোটা শুধু আকাশ থেকে নয়, আমার জীবন থেকেও সরে যাচ্ছে।
মা আর বোনেরা বাড়ি ফিরে এসেছেন।
আমি ছুটি নিয়ে সোজা বাড়িতে পৌঁছালাম।
ঘরে ঢুকতেই দেখলাম, মা চুপচাপ বসে আছেন। বোনেরা কেউ আমার দিকে তাকাচ্ছেন না। সেই নীরবতা যেন হাজারটা কথার চেয়েও ভারী।
আমি ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করলাম,
— “কী হয়েছে?”
মা আমার দিকে তাকালেন। চোখে কষ্ট, মুখে ক্লান্তি।
তিনি খুব শান্ত গলায় বললেন,
— “সবাই সব সম্পর্ককে সম্মান দিতে জানে না, বাবা।”
আমি কিছু বুঝতে পারছিলাম না।
বোনের দিকে তাকাতেই সে চোখ নামিয়ে ফেলল।
তারপর আস্তে করে বলল,
— “আমাদের খুব অপমান করেছে।”
মুহূর্তের জন্য মনে হলো, আমার চারপাশের সব শব্দ থেমে গেছে।
আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম,
— “কেন?”
কেউ উত্তর দিল না।
মা শুধু বললেন,
— “সব প্রশ্নের উত্তর সব সময় পাওয়া যায় না।”
কিন্তু আমার দরকার ছিল উত্তর।
কারণ আমি শুধু একজন মানুষকে ভালোবাসিনি, তার সঙ্গে একটা জীবন কল্পনা করেছিলাম।
সারারাত ঘুমাতে পারিনি।
বারবার মনে হচ্ছিল, কোথাও নিশ্চয়ই একটা ভুল হয়েছে।
সে তো এমন ছিল না।
যে মানুষ আমার সঙ্গে ভবিষ্যতের কথা বলেছে, সে কি সত্যিই আমার পরিবারকে অসম্মান করতে পারে?
ভোরের আলো ফুটতেই সিদ্ধান্ত নিলাম—
আমি নিজেই যাব।
শেষবারের মতো।
শেষবারের মতো সত্যিটা শুনব।
দুপুরের দিকে তার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
সেই বাড়ি।
যার সামনে দাঁড়িয়ে একদিন কত স্বপ্ন দেখেছিলাম।
আজ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে বুকের ভেতর শুধু অজানা একটা ভয়।
দরজায় কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে পরিচিত পায়ের শব্দ।
দরজা খুলল।
আমাদের চোখে চোখ পড়ল।
কিন্তু সেই চোখে আর কোনো পরিচিত আলো ছিল না।
সে আমাকে কিছুক্ষণ দেখল।
তারপর বলল,
— “কেন এসেছ?”
আমি ধীরে বললাম,
— “একটা উত্তর চাই।”
সে নিশ্চুপ।
আমি আবার বললাম,
— “আমার পরিবারকে অপমান করা হলো কেন?”
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তারপর এমন কিছু কথা বলল, যেগুলো আজও আমার স্মৃতিতে পাথরের মতো খোদাই হয়ে আছে।
সে বলল,
— “আমাদের পথ আলাদা।”
আমি বললাম,
— “পথ আলাদা হতে পারে। কিন্তু সম্মানটা তো আলাদা হওয়ার কথা নয়।”
সে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার দৃষ্টিতে কোনো রাগ ছিল না।
কোনো মায়াও ছিল না।
শুধু এক ধরনের দূরত্ব।
যেন আমি তার জীবনের বহু পুরোনো কোনো অধ্যায়।
আমি শেষবারের মতো বললাম,
— “আমি তো শুধু তোমাকে নিয়ে একটা সংসার করতে চেয়েছিলাম।”
সে ধীরে মাথা নাড়ল।
তারপর বলল,
— “সব স্বপ্ন সবার জন্য হয় না।”
আমি আর কিছু বলতে পারিনি।
কিছু মুহূর্ত আসে, যখন ভাষা মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে।
সেদিন আমারও তাই হয়েছিল।
আমি ধীরে ধীরে বাড়ির সামনে থেকে হাঁটা শুরু করলাম।
পেছন ফিরে আর একবারও তাকাইনি।
কারণ জানতাম—
যে দরজার ওপারে আমাকে আর ডাকা হবে না, সেই দরজার দিকে বারবার তাকিয়ে থাকার কোনো অর্থ নেই।
রাস্তার ধুলোয় হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে হলো, মানুষ আসলে একদিনে ভেঙে পড়ে না।
সে ভাঙে—
একটা অসমাপ্ত কথোপকথনে,
একটা নীরব দৃষ্টিতে,
একটা বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।
সেদিন আমি শুধু একটি বাড়ি থেকে ফিরে আসিনি।
ফিরে এসেছিলাম আমার সমস্ত স্বপ্নের কবরস্থান থেকে।
সন্ধ্যায় অফিসে ফিরে ছোট্ট ঘরটার দরজা বন্ধ করে অনেকক্ষণ বসে রইলাম।
টেবিলের ওপর তখনও পড়ে ছিল সেই খাতা—
“আমাদের আগামী।”
আমি ধীরে ধীরে খাতাটা খুললাম।
প্রথম পাতায় লেখা স্বপ্নগুলোর ওপর হাত বুলিয়ে দিলাম।
কলমটা হাতে নিলাম।
তারপর প্রথমবারের মতো সেই পাতায় একটি দাগ টেনে দিলাম।
সেদিন বুঝেছিলাম—
কিছু গল্পের সমাপ্তি মানুষ লেখে না।
সময় লিখে দেয়।
আর সেই সমাপ্তির কালি কখনো শুকায় না।
শেষ কথার পরে
কিছু বিদায়ের কোনো শব্দ থাকে না।
কেউ বলে না, “এটাই শেষ দেখা।”
কেউ বলে না, “আজকের পর আর কখনো কথা হবে না।”
তবুও একদিন হঠাৎ করেই মানুষ বুঝতে পারে—একটি অধ্যায় চিরতরে শেষ হয়ে গেছে।
সেদিন তার বাড়ি থেকে ফিরে আমি অনেকক্ষণ হাঁটলাম।
কোথায় যাচ্ছিলাম, জানতাম না।
রাস্তার দু’পাশে সারি সারি গাছ দাঁড়িয়ে ছিল। বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছিল। মানুষজন যে যার মতো বাড়ি ফিরছিল। দোকানগুলোতে বাতি জ্বলছিল। পৃথিবী তার নিয়মেই চলছিল।
শুধু আমার পৃথিবীটাই যেন থেমে গিয়েছিল।
অদ্ভুত না?
একজন মানুষের জীবন ভেঙে পড়লেও পৃথিবী এক সেকেন্ডের জন্যও থেমে থাকে না।
অফিসে ফিরে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিলাম।
ছোট্ট সেই ঘরটায় কত রাত আমরা ভবিষ্যতের গল্প বলেছি।
আজ একই ঘরটা অচেনা লাগছিল।
চেয়ারে বসতেই চোখ পড়ল টেবিলের ওপর রাখা মগটায়।
অনেকদিন আগে সে বলেছিল,
— “এত পুরোনো মগটা বদলাও না?”
আমি হেসে বলেছিলাম,
— “তুমি একদিন নতুন একটা এনে দিও।”
মগটা আর বদলানো হয়নি।
শুধু মানুষটা বদলে গেছে।
সেই রাতেই আমি তাকে শেষবারের মতো ফোন করেছিলাম।
একবার…
দুবার…
তিনবার…
প্রতিবারই একই উত্তর।
কলটি আর সংযুক্ত হলো না।
আমি একটি ছোট্ট বার্তা লিখলাম—
“তোমার সিদ্ধান্ত যদি এটাই হয়, আমি আর বিরক্ত করব না। শুধু ভালো থেকো।”
অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
কোনো উত্তর এল না।
পরদিন আবার চেষ্টা করলাম।
এবার দেখলাম, আমার বার্তা আর পৌঁছাচ্ছে না।
ফোনেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
ধীরে ধীরে বুঝলাম—
আমি আর তার যোগাযোগের তালিকায় নেই।
আমাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এত সহজে।
এত নিঃশব্দে।
কিছু মানুষ সম্পর্ক শেষ করে কথা বলে।
কিছু মানুষ ব্যাখ্যা দেয়।
আর কিছু মানুষ…
শুধু নীরব হয়ে যায়।
সেই নীরবতাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।
কারণ সেখানে রাগ নেই।
অভিমান নেই।
শুধু অনুপস্থিতি।
এরপর শুরু হলো আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ দিনগুলো।
সকালে ঘুম ভাঙত।
অফিসে যেতাম।
হিসাব করতাম।
ফাইল গুছাতাম।
মানুষের সঙ্গে কথা বলতাম।
বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিকই ছিল।
কিন্তু ভেতরে?
ভেতরে প্রতিদিন একটা করে ঘর খালি হয়ে যাচ্ছিল।
একদিন আলমারি পরিষ্কার করতে গিয়ে একটি ছোট্ট কাগজ পেলাম।
সেখানে আমার নিজের হাতের লেখায় লেখা ছিল—
“কখনো তাকে কাঁদতে দেব না।”
আমি অনেকক্ষণ কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
তারপর ভাঁজ করে আবার রেখে দিলাম।
কিছু প্রতিশ্রুতি ভাঙে না।
শুধু পূরণ হয় না।
দিন কেটে যাচ্ছিল।
মানুষজন হয়তো বুঝতেই পারছিল না, আমি ভেতরে ভেতরে কতটা বদলে যাচ্ছি।
সহকর্মীরা বলত,
— “তুমি আগের মতো হাসো না কেন?”
আমি হেসে বলতাম,
— “ঘুম কম হচ্ছে।”
আসলে ঘুম কম হচ্ছিল না।
শান্তি কমে গিয়েছিল।
এক সন্ধ্যায় অফিসের ছাদে উঠে বসেছিলাম।
আকাশটা সেদিন খুব পরিষ্কার ছিল।
একটা একটা করে তারা জ্বলছিল।
মনে পড়ল, একদিন এই আকাশের নিচেই আমরা ভবিষ্যতের বাড়ির কথা বলেছিলাম।
আমি ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলাম।
নিজেকে একটা প্রশ্ন করলাম—
“ভালোবাসা কি সত্যিই শেষ হয়ে যায়?”
অনেকক্ষণ পর নিজের মনই উত্তর দিল—
“ভালোবাসা হয়তো শেষ হয় না। শেষ হয়ে যায় সেই মানুষটির সঙ্গে ভবিষ্যৎ কল্পনা করার অধিকার।”
সেই রাতেই আমি একটা সিদ্ধান্ত নিলাম।
আমি আর কাউকে দোষ দেব না।
কাউকে অভিশাপও দেব না।
জীবন যদি আমার কাছ থেকে কিছু কেড়ে নিয়ে থাকে,
তাহলে হয়তো কোনো না কোনো শিক্ষা দেওয়ার জন্যই নিয়েছে।
আমি জানতাম না, সামনে কী আছে।
শুধু এটুকু জানতাম—
একদিন আমাকে আবার দাঁড়াতে হবে।
নিজের জন্য।
নিজের পরিবারের জন্য।
আর সেই মানুষটার জন্য নয়,
যে আমার জীবনের একটি অধ্যায় ছিল,
কিন্তু পুরো বইটি নয়।
রাত গভীর হলো।
টেবিলের ওপর রাখা খাতাটা বন্ধ করে দিলাম।
জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখলাম—
ভোর হতে এখনও অনেক বাকি।
তবুও দিগন্তের এক কোণে অন্ধকারটা একটু একটু করে হালকা হচ্ছে।
হয়তো এটাই জীবনের নিয়ম।
সবচেয়ে দীর্ঘ রাতেরও একদিন শেষ হয়।
কিন্তু সূর্য ওঠার আগে মানুষকে অন্ধকারের পুরো পথটাই একা হেঁটে পার হতে হয়।
ভাঙা মানুষটার নতুন যুদ্ধ
মানুষের জীবনে এমন কিছু সকাল আসে, যেদিন ঘুম ভাঙলেও জেগে উঠতে ইচ্ছে করে না।
সেদিনও ঠিক তেমনই একটি সকাল ছিল।
ফজরের আজান ভেসে আসছিল দূরের মসজিদ থেকে। জানালার ফাঁক গলে সূর্যের আলো ঘরে ঢুকছিল। অথচ আমার মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সব আলো যেন আমার ভেতরে এসে পৌঁছাতে পারছে না।
কয়েক মাস আগেও এই সকালগুলো অন্যরকম ছিল।
ঘুম ভাঙার পর প্রথম যে মানুষটার কথা মনে পড়ত, আজ সে শুধু একটি স্মৃতি।
একটি অসমাপ্ত গল্প।
একটি নাম, যাকে উচ্চারণ না করেও প্রতিদিন মনে পড়ে।
সেদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখলাম।
চোখের নিচে কালি।
মুখে ক্লান্তি।
দাড়ি অগোছালো।
মনে হলো, এই মানুষটাকে আমি চিনি না।
যে ছেলেটা একদিন ভবিষ্যতের স্বপ্নে ভরা ছিল, সে কোথায় হারিয়ে গেল?
আমি আয়নার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বললাম,
“আর কতদিন?”
প্রশ্নটা কাউকে করা নয়।
নিজেকেই।
অফিসে যাওয়ার পথে বুঝলাম, পৃথিবী কাউকে ছাড় দেয় না।
বাস ঠিক সময়ে চলছে।
দোকান খুলছে।
মানুষ বাজার করছে।
স্কুলের বাচ্চারা ইউনিফর্ম পরে হাসতে হাসতে যাচ্ছে।
কেউ জানে না, ভিড়ের মধ্যে হাঁটা একজন মানুষের বুকের ভেতর কত বড় শূন্যতা নিয়ে সে বেঁচে আছে।
হয়তো জানার প্রয়োজনও নেই।
প্রত্যেক মানুষই নিজের অদৃশ্য যুদ্ধ লড়ে।
সেদিন অফিসে বসে ফাইল গুছাতে গিয়ে হঠাৎ উপলব্ধি করলাম—
আমি এতদিন ভালোবাসার জন্য বেঁচেছি।
কিন্তু নিজের জন্য কী করেছি?
এই প্রশ্নটাই আমাকে নাড়া দিল।
আমি খাতা খুলে একটি নতুন পাতা বের করলাম।
উপরে বড় করে লিখলাম—
“নতুন জীবন।”
তার নিচে প্রথম লাইন—
“নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।”
দ্বিতীয় লাইন—
“মা-বাবার মুখে হাসি ফিরিয়ে আনতে হবে।”
তৃতীয় লাইন—
“কোনো কষ্টকে নিজের শেষ পরিচয় হতে দেওয়া যাবে না।”
কলমটা নামিয়ে রাখলাম।
অনেকদিন পর মনে হলো, আমি প্রথমবার নিজের সঙ্গে কথা বলছি।
সেই দিন থেকে আমি বদলে যেতে শুরু করলাম।
অফিসের কাজ আরও মন দিয়ে করতে লাগলাম।
নতুন নতুন দক্ষতা শেখার চেষ্টা করলাম।
রাতে আর অকারণে অপেক্ষা করতাম না।
বরং বই পড়তাম।
কম্পিউটারে নতুন বিষয় শিখতাম।
স্বপ্ন এবারও ছিল।
তবে সেই স্বপ্নে আর কাউকে নিয়ে নয়।
নিজেকে নিয়ে।
তবুও মানুষ কি এত সহজে অতীত থেকে বেরিয়ে আসতে পারে?
পারিনি।
মাঝে মাঝে বাজারে গেলে মনে হতো, হয়তো হঠাৎ দেখা হয়ে যাবে।
অপরিচিত কোনো কণ্ঠ শুনলে মনে হতো, সে ডাকছে।
কোনো পরিচিত সুগন্ধ বাতাসে ভেসে এলে মনে পড়ে যেত, একদিন এই গন্ধের সঙ্গে কত স্মৃতি জড়িয়ে ছিল।
আমি বুঝলাম—
স্মৃতি চলে যায় না।
মানুষ শুধু তার সঙ্গে বাঁচতে শিখে।
এক রাতে অফিসের ছাদে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ।
আমি হঠাৎ নিজেকেই বললাম,
“যে মানুষ চলে যেতে চেয়েছে, তাকে ধরে রাখার চেষ্টা কেন?”
বাতাস কোনো উত্তর দিল না।
কিন্তু বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত শান্তি নেমে এলো।
হয়তো উত্তর সবসময় শব্দে আসে না।
কখনো কখনো নীরবতাও মানুষকে পথ দেখায়।
সেই রাতেই আমি আমার পুরোনো খাতাটা বের করলাম।
“আমাদের আগামী”।
অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম।
তারপর ধীরে ধীরে খাতার শেষ পাতায় লিখলাম—
“আজ থেকে এই খাতা শুধু আমার।
যে স্বপ্নগুলো একদিন ‘আমাদের’ ছিল,
সেগুলো আজ থেকে ‘আমার’ হবে।”
লিখে কলমটা বন্ধ করে দিলাম।
চোখের কোণে পানি এসেছিল।
কিন্তু এবার সেই কান্নায় ভেঙে পড়া ছিল না।
ছিল বিদায়।
সেদিন প্রথমবার বুঝলাম—
জীবনে সবচেয়ে বড় প্রতিশোধ কাউকে হারিয়ে দেওয়া নয়।
সবচেয়ে বড় প্রতিশোধ হলো,
নিজেকে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া,
যেখানে একদিন নিজের অতীতের দিকে তাকিয়ে বলতে পারবে—
“তুমি আমাকে ভেঙেছিলে,
কিন্তু শেষ করতে পারোনি।”
সেই রাতের পর আমার জীবন নতুন দিকে মোড় নিল।
আমি আর অপেক্ষা করলাম না।
আর কোনো উত্তর খুঁজলাম না।
শুধু নিজের ভাঙা হৃদয়ের ইটগুলো একে একে জোড়া লাগাতে শুরু করলাম।
কারণ আমি বুঝে গিয়েছিলাম—
ভালোবাসা মানুষকে সুন্দর করে।
কিন্তু হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসা যদি মানুষকে আরও শক্ত করে তুলতে পারে,
তাহলে সেই হারও একদিন আশীর্বাদ হয়ে ওঠে।
আমি তখনও জানতাম না—
বহু বছর পরে একদিন আমার জীবন এমন জায়গায় পৌঁছাবে,
যেখানে অর্থের অভাব থাকবে না,
সম্মানের অভাব থাকবে না,
শুধু একটি জিনিসের অভাব থেকে যাবে—
নিঃস্বার্থভাবে কাউকে বিশ্বাস করার সেই পুরোনো হৃদয়।
যে দাগ সময়ও মুছতে পারেনি
সময়কে সবাই বড় চিকিৎসক বলে।
বলে, সময় নাকি সব ক্ষত সারিয়ে দেয়।
অনেক বছর পর বুঝেছি—
কথাটা পুরোপুরি সত্য নয়।
সময় ক্ষত শুকিয়ে দেয়,
কিন্তু দাগ মুছে দেয় না।
কিছু দাগ মানুষের শরীরে নয়,
আত্মায় লেগে থাকে।
বছর কেটে গেছে।
সেই ছোট্ট এনজিওর চাকরিটা আর নেই।
জীবন আমাকে অনেক দূরে নিয়ে এসেছে।
যে ছেলেটা একদিন মাসের শেষে টাকার হিসাব মিলাতে পারত না, সে আজ নিজের পরিশ্রমে দাঁড়িয়ে আছে। কাজ বদলেছে, পরিচয় বদলেছে, আয়ের অঙ্কও বদলেছে। একসময় যেটুকু কল্পনা করতাম, তার চেয়েও অনেক বেশি অর্জন করেছি।
মানুষ এখন আমাকে সম্মান করে।
আমার কাজের মূল্য দেয়।
অনেকে পরামর্শ চায়।
কেউ কেউ বলে,
— “ভাই, আপনার মতো হতে চাই।”
আমি শুধু হাসি।
কারণ তারা আমার আজকে দেখে।
গতকালটা দেখে না।
মাঝে মাঝে আলমারির এক কোণে রাখা পুরোনো খাতাটা বের করি।
পাতাগুলো হলদে হয়ে গেছে।
কালিও কিছুটা ফিকে।
প্রথম পাতায় এখনও লেখা—
“আমাদের আগামী।”
আমি আঙুল বুলিয়ে দিই।
তারপর খাতাটা আবার বন্ধ করে রাখি।
জীবনের কিছু জিনিস ফেলে দেওয়া যায় না।
কারণ সেগুলো আর মানুষ নয়,
স্মৃতি হয়ে যায়।
একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে হঠাৎ সেই পুরোনো উপজেলার রাস্তা দিয়ে যেতে হলো।
কাজের প্রয়োজনে।
গাড়ির জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখি—
সবকিছু যেন একই আছে।
চায়ের দোকানটা।
বাঁশঝাড়।
পুকুরের ঘাট।
শুধু আমি আর আগের আমি নেই।
ড্রাইভার জিজ্ঞেস করল,
— “স্যার, এখানে একটু থামব?”
আমি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললাম,
— “না… চলুন।”
কিছু জায়গায় ফিরে যাওয়া মানেই ফিরে পাওয়া নয়।
কখনো কখনো ফিরে না যাওয়াটাই সবচেয়ে বড় সাহস।
সেই রাতে বাড়ি ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম।
অনেকক্ষণ নিজের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
হঠাৎ মনে হলো,
আমি কি সত্যিই তাকে ভুলে গেছি?
না।
মানুষকে হয়তো ভুলে যাওয়া যায় না।
কিন্তু তার অনুপস্থিতি নিয়ে বাঁচতে শেখা যায়।
এটাই হয়তো পরিণত হওয়া।
আমার জীবনে আজ অর্থ আছে।
সম্মান আছে।
স্বপ্ন পূরণের সামর্থ্য আছে।
একটা সময় যে কথাগুলো শুনে বুক ভেঙে গিয়েছিল—
আজ সেগুলো আর আমাকে কাঁদায় না।
শুধু ভাবায়।
কারণ জীবন অদ্ভুতভাবে মানুষকে শেখায়—
যে মানুষ তোমার বর্তমানকে দেখে তোমার মূল্য ঠিক করে,
সে কখনো তোমার ভবিষ্যতের যোগ্য ছিল না।
মাঝে মাঝে রাত গভীর হলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখি।
চাঁদটা এখনও আগের মতোই ওঠে।
বৃষ্টি এখনও টিনের চালে একই শব্দ তোলে।
শুধু পাশে দাঁড়িয়ে সেই স্বপ্নের গল্প শোনার মানুষটি আর নেই।
তবু আজ আর বুক ভেঙে কান্না আসে না।
শুধু একটুখানি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
যেন কোনো পুরোনো বইয়ের শেষ পাতায় আঙুল রেখে কেউ আস্তে করে বলে—
“ভালো থেকো।”
জীবন আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে।
আর অনেক কিছু কেড়েও নিয়েছে।
কিন্তু সবচেয়ে বড় যে উপহারটা দিয়েছে,
সেটা হলো—
নিজেকে নতুন করে চিনতে শেখানো।
আমি বুঝেছি,
ভালোবাসা মানুষকে দুর্বল করে না।
ভুল জায়গায় নিজের পুরো অস্তিত্ব সমর্পণ করাই মানুষকে ভেঙে দেয়।
আর একবার ভেঙে গিয়েও যে আবার উঠে দাঁড়াতে পারে,
সে আর আগের মানুষ থাকে না।
সে আরও শান্ত হয়।
আরও গভীর হয়।
আরও শক্ত হয়।
আজ যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে,
“তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?”
আমি হয়তো বলব—
ভালোবাসো।
কিন্তু নিজেকে হারিয়ে নয়।
বিশ্বাস করো।
কিন্তু নিজের সম্মান বিসর্জন দিয়ে নয়।
স্বপ্ন দেখো।
কিন্তু সেই স্বপ্নের ভিত নিজের আত্মমর্যাদার ওপর গড়ে তোলো।
কারণ মানুষ হারিয়ে গেলে নতুন মানুষ আসতে পারে।
অর্থ হারালে আবার উপার্জন করা যায়।
সময় হারালে নতুন সময় আসে।
কিন্তু একবার আত্মসম্মান হারিয়ে ফেললে,
সেটা ফিরে পেতে সবচেয়ে বেশি সময় লাগে।
আজ বহু বছর পর আমি আর কাউকে দোষ দিই না।
কারও প্রতি ঘৃণাও নেই।
শুধু একটি অদৃশ্য দাগ আছে।
যে দাগ আমাকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়—
আমি একদিন খুব গভীরভাবে ভালোবেসেছিলাম।
আমি একদিন খুব সরল ছিলাম।
আমি একদিন ভেঙে পড়েছিলাম।
আর সেই ভাঙা মানুষটাই একদিন আবার নিজেকে গড়ে তুলেছিল।
হয়তো এটাই আমার গল্পের আসল সমাপ্তি।
না, একটি প্রেমের সমাপ্তি নয়।
একজন মানুষের পুনর্জন্মের গল্প।
কারণ কিছু ভালোবাসা মানুষকে একসঙ্গে রাখে।
আর কিছু ভালোবাসা…
মানুষকে নতুন মানুষ বানিয়ে দিয়ে চলে যায়।
সেই দাগ আজও আছে।
হয়তো সারাজীবন থাকবে।
তবে আজ আর সে দাগ আমাকে দুর্বল করে না।
সে শুধু নীরবে মনে করিয়ে দেয়—
সবচেয়ে অন্ধকার রাতের পরেও ভোর হয়।
আর যে মানুষ ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে,
তার জীবন একদিন আলোয় ভরে উঠেই।
একটি অপ্রেরিত চিঠি
মানুষ সব কথা মুখে বলতে পারে না।
কিছু কথা চোখে আটকে যায়।
কিছু কথা দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে আসে।
আর কিছু কথা…
সাদা কাগজে লেখা হয়, কিন্তু কখনো গন্তব্যে পৌঁছায় না।
সেদিন রাতটা ছিল অদ্ভুত নীরব।
বাইরে হালকা বৃষ্টি পড়ছিল। জানালার কাঁচ বেয়ে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসছিল। হাতে ছিল এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা।
অনেক বছর পর পুরোনো ডায়েরিটা আবার খুললাম।
পাতার পর পাতা উল্টাতে উল্টাতে মনে হলো, যেন নিজের অতীতের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
একটি খালি পৃষ্ঠায় এসে কলম থেমে গেল।
তারপর লিখতে শুরু করলাম—
প্রিয়,
তোমাকে কী নামে ডাকব, জানি না।
যে নামে একদিন ডেকেছিলাম, সেই নাম আজও বুকের ভেতর আছে। কিন্তু অনেক বছর ধরে ঠোঁটে আসেনি।
জানো, অনেকদিন আমি তোমাকে ঘৃণা করতে চেয়েছিলাম।
পারিনি।
আবার আগের মতো ভালোবাসতেও পারিনি।
শেষ পর্যন্ত বুঝেছি, কিছু মানুষকে না ভালোবাসা যায়, না ঘৃণা করা যায়।
শুধু স্মৃতি হিসেবে মেনে নিতে হয়।
তুমি যখন চলে গেলে, আমার মনে হয়েছিল পৃথিবী শেষ হয়ে গেছে।
আজ বুঝি, পৃথিবী শেষ হয়নি।
শুধু আমার জীবনের একটি অধ্যায় শেষ হয়েছিল।
তোমাকে হারিয়ে আমি অনেক রাত না ঘুমিয়ে কাটিয়েছি।
অনেক প্রশ্ন করেছি।
নিজেকে দোষ দিয়েছি।
ভাবতাম, কোথায় ভুল করেছিলাম?
আজ আর সেই প্রশ্ন করি না।
কারণ প্রতিটি সম্পর্কের শেষের জন্য একজন মানুষ দায়ী থাকে না।
জীবন কখনো কখনো দুইজন মানুষকে দুই ভিন্ন তীরে দাঁড় করিয়ে দেয়।
আমি আজ ভালো আছি।
এটা লিখতে আমার আর কষ্ট হয় না।
আমার জীবনে এখন কাজ আছে।
দায়িত্ব আছে।
স্বপ্ন আছে।
হয়তো সেই সরল ছেলেটা আর নেই।
কিন্তু যে মানুষটা আজ আয়নার সামনে দাঁড়ায়, তাকে আমি সম্মান করতে শিখেছি।
একটা কথা স্বীকার করব?
তুমি যদি সেদিন চলে না যেতে, তাহলে হয়তো আমি আজকের আমি হতে পারতাম না।
তুমি আমাকে ভেঙেছিলে।
আর সেই ভাঙা টুকরোগুলো জোড়া দিতে গিয়েই আমি নিজেকে নতুন করে চিনেছি।
তোমাকে ধন্যবাদ বলব না।
দোষও দেব না।
শুধু বলব—
জীবনে যেখানেই থাকো, ভালো থেকো।
কারণ আমি একসময় সত্যিই তোমার ভালো চেয়েছিলাম।
আর সত্যিকারের শুভকামনা সময়ের সঙ্গে বদলে যায় না।
ভালো থেকো।
— যে মানুষটা একদিন তোমার সঙ্গে একটি ছোট্ট সংসারের স্বপ্ন দেখেছিল।
চিঠিটা লেখা শেষ করে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম।
কোনো ঠিকানা লিখলাম না।
কোনো খামও নিলাম না।
কারণ এই চিঠি পাঠানোর জন্য লেখা হয়নি।
এই চিঠি লেখা হয়েছিল আমার নিজের ভেতরের ভার নামিয়ে রাখার জন্য।
তারপর ডায়েরিটা বন্ধ করে আলমারির ভেতর রেখে দিলাম।
জানালার পাশে এসে দাঁড়ালাম।
বৃষ্টি থেমে গেছে।
দিগন্তে ভোরের আলো ফুটছে।
আমি হঠাৎ বুঝতে পারলাম—
ক্ষমা মানে অতীতকে ভুলে যাওয়া নয়।
ক্ষমা মানে সেই অতীতকে আর নিজের বর্তমানের শাসক হতে না দেওয়া।
অনেক বছর আগে যে মানুষটা ভাঙা হৃদয় নিয়ে এই জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কেঁদেছিল,
আজ সেই মানুষটাই একই জানালার পাশে দাঁড়িয়ে শান্তভাবে হাসতে পারে।
হয়তো এটাই সুস্থ হয়ে ওঠা।
হয়তো এটাই বেঁচে থাকার সবচেয়ে সুন্দর রূপ।
কারণ কিছু গল্প শেষ হয় না।
তারা শুধু মানুষের ভেতরে অন্য এক অর্থ নিয়ে বেঁচে থাকে।
আর কিছু চিঠি…
কখনো ডাকবাক্সে পৌঁছায় না।
তবুও তারা ঠিকই তাদের গন্তব্যে পৌঁছে যায়—
মানুষের নিজের হৃদয়ে।
শেষবার ফিরে দেখা
সময় মানুষকে শুধু সামনে নিয়ে যায় না।
কখনো কখনো সে মানুষকে আবার পুরোনো পথেও ফিরিয়ে আনে।
তবে সেই ফেরা আর আগের মতো হয় না।
একসময় যে পথ ধরে মানুষ স্বপ্ন নিয়ে হাঁটত, বহু বছর পর সেই একই পথে হাঁটে শুধু একটি শিক্ষা নিয়ে।
অনেক বছর কেটে গেছে।
জীবন এখন অনেকটাই গুছিয়ে নিয়েছি।
কাজের ব্যস্ততা বেড়েছে।
মানুষের আস্থা, সম্মান, দায়িত্ব—সবকিছুই যেন একে একে জীবনের অংশ হয়ে গেছে।
একদিন অফিসের একটি কাজে আবার সেই উপজেলায় যেতে হলো।
গাড়ি যখন পরিচিত রাস্তায় ঢুকল, বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল।
এটাই তো সেই রাস্তা…
যেখানে প্রতিদিন সন্ধ্যায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতাম।
এটাই সেই মোড়…
যেখান থেকে একসময় একটি পরিচিত ছায়া হেঁটে আসত।
সবকিছু যেন একই রয়ে গেছে।
শুধু সময় বদলে দিয়েছে মানুষগুলোকে।
ড্রাইভার বলল,
— “স্যার, একটু চা খাবেন?”
আমি জানালার বাইরে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললাম,
— “হ্যাঁ, চলুন।”
চায়ের দোকানটা নতুন হয়েছে।
কিন্তু চায়ের গন্ধটা আগের মতোই।
এক কাপ চা হাতে নিয়ে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম।
মনে হলো, এই জায়গাটা আমাকে চিনে ফেলেছে।
শুধু আমি আর আগের সেই মানুষটি নই।
চা শেষ করে হেঁটে একটু সামনে গেলাম।
দূরে সেই অফিস ভবনটি দেখা যাচ্ছে।
দেয়ালে নতুন রং হয়েছে।
জানালাগুলো বদলে গেছে।
কিন্তু বারান্দাটা এখনও আছে।
সেই বারান্দা…
যেখানে দাঁড়িয়ে একদিন ভবিষ্যতের গল্প বলেছিলাম।
আমি কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলাম।
তারপর খুব ধীরে চোখ বন্ধ করলাম।
মনে মনে বললাম—
“ধন্যবাদ।”
ধন্যবাদ সেই দিনগুলোকে,
যারা আমাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছিল।
ধন্যবাদ সেই কষ্টকে,
যে আমাকে শক্ত হতে শিখিয়েছে।
ধন্যবাদ সেই ভাঙনকে,
যে আমাকে নিজের মূল্য বুঝতে শিখিয়েছে।
আমি আর কোথাও যাইনি।
কাউকে খুঁজিনি।
কোনো পুরোনো দরজায় কড়া নাড়িনি।
কারণ কিছু গল্পকে অতীতেই রেখে দেওয়া সবচেয়ে সুন্দর সমাপ্তি।
মানুষ সব প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য বাঁচে না।
কিছু উত্তর না জানাও শান্তির একটি অংশ।
ফেরার সময় গাড়ির জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখলাম,
সূর্য ধীরে ধীরে পশ্চিমে হেলে পড়ছে।
হঠাৎ মনে হলো,
জীবনও ঠিক সূর্যের মতো।
সে প্রতিদিন ডুবে যায়।
আবার প্রতিদিনই নতুন করে ওঠে।
বাড়ি ফিরে সেই পুরোনো খাতাটা শেষবারের মতো বের করলাম।
প্রথম পাতায় লেখা—
“আমাদের আগামী।”
আমি খাতার শেষ পাতায় লিখলাম—
“আজ থেকে এই গল্প আর কোনো অপেক্ষার নয়।
এই গল্প একজন মানুষের, যে ভালোবেসেছিল।
হারিয়েছিল।
ভেঙে পড়েছিল।
তারপর আবার উঠে দাঁড়িয়েছিল।”
কলমটা বন্ধ করে অনেকক্ষণ খাতার ওপর হাত রেখে বসে রইলাম।
তারপর ধীরে ধীরে খাতাটা আলমারির ভেতর রেখে দিলাম।
এবার আর তালা লাগালাম না।
কারণ স্মৃতিকে বন্দি করে রাখার দরকার হয় না।
তাকে শুধু তার জায়গাটা বুঝিয়ে দিতে হয়।
রাতে ছাদে উঠে দাঁড়ালাম।
আকাশভরা তারা।
শীতল বাতাস।
অনেকদিন পর বুকের ভেতর এক ধরনের প্রশান্তি অনুভব করলাম।
হঠাৎ মনে হলো—
আমি আর কাউকে খুঁজছি না।
আমি আর কোনো উত্তর চাইছি না।
আমি শুধু বেঁচে আছি।
নিজের মতো।
নিজের সম্মান নিয়ে।
নিজের অর্জন নিয়ে।
আর নিজের ভেতরে জন্ম নেওয়া নতুন মানুষটিকে নিয়ে।
মানুষ প্রায়ই জিজ্ঞেস করে,
“ভালোবাসার শেষ কোথায়?”
আজ আমি উত্তর জানি।
ভালোবাসার শেষ বিচ্ছেদে নয়।
ভালোবাসার শেষ তখনই হয়,
যখন একজন মানুষ নিজের ভেতরের আলোটাকে আবার খুঁজে পায়।
আমি সেই আলো খুঁজে পেয়েছি।
অনেক দেরিতে।
অনেক কান্নার পরে।
অনেক দীর্ঘ রাতের পরে।
আজও মাঝে মাঝে পুরোনো স্মৃতি ফিরে আসে।
কিন্তু তারা আর আমাকে কাঁদায় না।
শুধু মনে করিয়ে দেয়—
একদিন আমি খুব আন্তরিকভাবে ভালোবেসেছিলাম।
সেই ভালোবাসা আমাকে একজন মানুষ হারিয়েছিল,
কিন্তু একজন নতুন মানুষকে জন্ম দিয়েছিল।
হয়তো এটাই জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্চর্য।
আমরা যাদের হারিয়ে ফেলি,
তারা সবসময় আমাদের জীবন থেকে কিছু নিয়ে যায় না।
কখনো কখনো তারা অজান্তেই আমাদের এমন একজন মানুষ বানিয়ে দিয়ে যায়,
যাকে আমরা আগে কখনো চিনতাম না।
আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলাম।
তারপর আস্তে করে বললাম—
“ভালো থেকো…
যেখানেই থাকো।
তোমাকে নয়,
আজ আমি আমার অতীতকে বিদায় জানালাম।”
আকাশ নিশ্চুপ ছিল।
কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেই যেন আমি উত্তর শুনতে পেলাম।
গল্পটি শেষ হয়েছে।
কিন্তু জীবন…
জীবন এখনও চলছে।
লেখাঃ শফিকুল ইসলাম বিশ্বাস

